নবীগঞ্জ উপজেলার পরিচিতি

নামকরণ: সমতল, হাওড় ও পাহাড় ঘেরা হযরত শাহজালাল(র:)’র সিলেট বিজয়ের প্রথম অভিযানের স্মৃতিবিজড়িত পুণ্যভূমি নবীগঞ্জের নামকরণের ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত জনশ্রুতি মতে, হযরত শাহ নবী বক্স (র:) নামে জনৈক কামিল দরবেশ ইসলামের মহান বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে আগমন করেন এবং প্রবাহিত শাখা-বরাক নদীর তীরে আস্তানা গাড়েন। তাঁর স্থাপিত আস্তানাকে কেন্দ্র করে লোকসমাগম বাড়তে থাকার ফলে এখানে একটি গঞ্জ বা বাজারের গোড়াপত্তন শুরু হয়। পরবর্তীতে তাঁর নামের সম্মানার্থে এ গঞ্জ বা বাজারের নামকরণ করা হয় নবীগঞ্জ।

নবীগঞ্জ নামকরণের ক্ষেত্রে অন্য একটি ভিন্নমত প্রচলিত আছে, যে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ নবীগঞ্জ নামকরণ করা হয়েছিল।


প্রথম মতটি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্টে লিপিবদ্ধ করা আছে এবং দ্বিতীয় মতটি সম্পর্কে ডাঃ মোহাম্মদ আফজাল ও সৈয়দ মোস্তফা কামাল সম্পাদিত ‘হবিগঞ্জ পরিক্রমা’ গ্রন্থে প্রথম মতটি নাকচ করে দ্বিতীয় মতটির গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরেছেন এবং তাদের নবীগঞ্জ নাম করণের যুক্তিটি গ্রহণযোগ্য।

অবস্থান ও আয়তন :
২৪°২৫´ থেকে ২৪°৪১´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯১°২৪´ থেকে ৯১°৪০´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত এই উপজেলাটির উত্তরে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই ও জগন্নাথপুর উপজেলা, দক্ষিণে হবিগঞ্জ সদর ও বাহুবল উপজেলা, পূর্বে মৌলভীবাজার জেলার মৌলভীবাজার সদর ও শ্রীমঙ্গল এবং সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলা এবং পশ্চিমে বানিয়াচং উপজেলা। উপজেলার মোট আয়তন ৪৩৯.৬০ বর্গ কিলোমিটার।

প্রশাসনিক ক্রমবিকাশে নবীগঞ্জ:
ব্রিটিশ শাসনে নবীগঞ্জ:
১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে পলাশী বিপর্যয়ের ৮ বছর পর ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহারও উড়িষ্যার দেওয়ানী সনদ লাভ করে। এবছরই সিলেট ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসে। ১৮৮৪ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সিলেট ছিল ঢাকা বিভাগের অধীনে। ১৯০৫ খৃষ্টাব্দে বাংলাকে ভাগ করে পূর্ববঙ্গ আসাম প্রদেশ সৃষ্টি করা হলে সিলেটকে চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৪৭ সালের ১৩ই আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বদিন পর্যন্ত সিলেট আসামের ১টি জেলা হিসেবে গণ্য ছিল। অর্থাৎ এই সময়ে নবীগঞ্জ আসাম প্রদেশের ১টিজেলা হিসেবে সিলেটের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ব্রিটিশের কবল থেকে মুক্ত হয়ে ১টি স্বাধীন সার্বভৌম পাকিস্তান কায়েম হলে সিলেট তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ১টি জেলায় পরিগণিত হয়। তখন সিলেটকে পুনরায় চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্ভুক্ত করা হলে নবীগঞ্জকে চট্টগ্রাম বিভাগে ন্যস্ত করা হয়। ১৯৮৪ সালে সাবেক সেনা শাসক (রাষ্ট্রপতি) এইচ.এম.এরশাদ প্রশাসনিক বিকেন্দ্রী করণের অংশ হিসেবে মহকুমা গুলোকে জেলায় পরিণত করলে সিলেট জেলাকে ৪টি জেলায় বিভক্ত করা হয়।যথা-সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ।


১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদাজিয়া কর্তৃক উপরোক্ত ৪টিজেলার সমন্বয়ে বাংলাদেশের ৬ষ্ঠ বিভাগ হিসেবে সিলেট বিভাগ ঘোষণা করেন। ১৯৯৫ সালের ১লা আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সিলেট বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়।

রাজস্ব জেলা নবীগঞ্জ ও এর আওতাধীন পরগনা সমূহ:
জন উইলস এর আমলে ১০টি রাজস্ব জেলার মধ্যে নবীগঞ্জ ছিল ১টি অন্যতম রাজস্ব জিলা এবং এর অধীনস্থ ছিল মোট ১৬টি পরগনা এগুলো হচ্ছে
১।দিনারপুর
২।মান্দারকান্দি
৩।চৌকি
৪।মুড়াকরি
৫।বানিয়াচং
৬।কুর্শা
৭।জোয়ার বানিয়াচং
৮।আগনা
৯।বিথঙ্গঁল
১০।জলসুখা
১১।জন্তরী
১২।বাজেসুনাইত্যা
১৩।সত্রসতী
১৪।জোয়ানশাহী
১৫।বাজেসত্রসতী
১৬।কিংকুর্শা

নবীগঞ্জ মুন্সেফী আদালত :
“হিস্ট্রি এন্ড স্ট্যাটিস্টিক অব ঢাকা ডিভিশন” নামক গ্রন্থে আছে বৃহত্তর সিলেটে ৬টি মুন্সেফী আদালত ছিল। তন্মধ্যে নবীগঞ্জে ১টি অন্যতম মুন্সেফী আদালত ছিল। যার আয়তন ছিল সরসতী পরগনার শেষ অর্থাৎ শ্রীমঙ্গল পর্যন্ত। ১৮৭৮ সালে হবিগঞ্জ মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হলে নবীগঞ্জে মুন্সেফী আদালত বিলুপ্ত হয়।

নবীগঞ্জ আধুনিক থানা:
১৯২২ সালের ১০ জানুয়ারি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নবীগঞ্জকে ১টি আধুনিক থানা ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৩ সালে নবীগঞ্জকে মান উন্নীত থানায় রূপান্তরিত করা হয়। ১৯৮৪ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ.এম. এরশাদের আমলে নবীগঞ্জকে উপজেলা ঘোষণা করা হয়।

সার্কেল প্রথায় নবীগঞ্জ:
ব্রিটিশ শাসনামলে নবীগঞ্জকে ৪১ টি সার্কেলে বিভক্ত করা হয়। সার্কেলের প্রধান নির্বাহীকে সরপঞ্চ বলা হতো। ১৯৫৮ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান কর্তৃক সার্কেল প্রথা বিলুপ্ত হয়ে ইউনিয়ন কাউন্সিল গঠিত হয়। এ সময়ে নবীগঞ্জকে ১২টি ইউনিয়ন কাউন্সিলে বিভক্ত করা হয়। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ইউনিয়ন পরিষদ গঠিত হয়। তখন নবীগঞ্জকে ১৩ টি ইউনিয়ন পরিষদে বিভক্ত করা হয়। ১৯৯৭ সালে নবীগঞ্জকে পৌরসভায় উন্নীত করা হয়।

এক নজরে নবীগঞ্জ উপজেলা

উপজেলা : নবীগঞ্জ জেলা : হবিগঞ্জ
একনজরে উপজেলা:
আয়তন -৪৩৯.৬০ বর্গ কিলোমিটার
জনসংখ্যা -২৮৫০৪০জন
জনসংখ্যার ঘনত্ব -৬৪৮জন
নির্বাচনীএলাকা -২৩৯(হবিগঞ্জ-১) নবীগঞ্জ-বাহুবল
ইউনিয়ন, পৌরসভা -ইউনিয়ন ১৩(তের) টি এবং পৌরসভা-০১টি
মৌজা -২১৯টি
সরকারী হাসপাতাল -০১টি
স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ক্লিনিক -ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র ৫টি
-স্যাটেলাইট ক্লিনিক
৩১৪টিইপিআই কেন্দ্র
২৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক
পোষ্ট অফিস -২২টি
নদ-নদী -৩টি
হাট-বাজার -২০টি
ব্যাংক/বীমা ‘ -১৭টি

ইউনিয়ন সমূহ

০১ নং বড় ভাকৈর (পশ্চিম)
০২ নং বড় ভাকৈর (পূর্ব)
০৩ নং ইনাতগঞ্জ
০৪ নং দিঘলবাক
০৫ নং আউশকান্দি
০৬ নং কুর্শি
০৭ নং করগাঁও
০৮ নং নবীগঞ্জ
০৯ নং বাউসা
১০ নং দেবপাড়া
১১ নং গজনাইপুর
১২ নং কালিয়ারভাঙ্গা
১৩ নং পানিউমদা

-শাহাবুদ্দিন শুভ

তথ্য সূত্র :
১. উইকিপিডিয়া
২. তথ্য বাতায়ন
৩. বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা – হবিগঞ্জ
৪. নবীগঞ্জ উপজেলার মানচিত্রের ছবি বাংলাপিডিয়া থেকে নেওয়া।

Facebook Comments

About SylhetPedia

Read All Posts By SylhetPedia

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *