সুরমা নদী

সুরমা নদীর (Surma River ) উৎপত্তি :: সিলেট বিভাগের দুটি প্রধান নদী সুরমা ও কুশিয়ারার জন্ম হয়েছে একটি নদী হতে। সেটি বরাক নদী। মণিপুর পাহাড়ে মাও সংসাং হতে বরাক নদীর উৎপত্তি। আসামের নাগা মণিপুর অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে নদীটি দুই শাখায় বিভক্ত হয়ে জকিগঞ্জ, কানাইঘাট,বিয়ানীবাজার, সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সিলেট জেলায় প্রবেশ করেছে। এর উত্তরের শাখাটি সুরমা পশ্চিম দিকে বিশ্বনাথ উপজেলা হয়ে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। আজমিরিগঞ্জের কাছে উত্তর সিলেটের সুরমা, আর দক্ষিণের শাখা সিলেটের কুশিয়ারা নদী এবং হবিগঞ্জে সিলেটের কালনী নদী একসঙ্গে মিলিত হয়েছে। এর পরে সুরমা ও কুশিয়ারার মিলিত প্রবাহ কালনী নামে দক্ষিণে কিছুদূর প্রবাহিত হয়ে মেঘনা নাম ধারণ করেছে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদী দুটি বৃহত্তর সিলেটে জেলাকে বেষ্টন করে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার ভাটিতে গিয়ে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে। মেঘনা ভৈরব বাজারে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে এবং চাঁদপুরের কাছে পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়ে মেঘনা নামে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।

অমলসিদ থেকে ছাতক পর্যন্ত হতে এর সীমানা ও দৈর্ঘ্য ১৬৪ কিলোমিটার। এই অংশে কয়েকটি বড় বড় বক্রখাত ছিল। ১৯৫৪-৭০ সালের মধ্যে সেগুলো কেটে সোজা করায় দৈর্ঘ্য হ্রাস পেয়েছে। এখানে নদী গড়ে ৭২ মিটার প্রশস্ত এবং ৮.৬ মিটার গভীর। বরাকের জলের ৪০ শতাংশ এতে প্রবাহিত হলেও সুরমাই বরাকের মুল প্রবাহরূপে চিহ্নিত।

সুরমা নদীর গতিধারা :: সুরমা নদী বাংলাদেশের প্রধান নদীসমূহের অন্যতম। এটি সুরমা-মেঘনা নদী ব্যবস্থার অংশ। উত্তর পূর্ব ভারতের বরাক নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করার সময় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে বিভক্ত হয়ে যায়। সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ এর উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনায় মিশেছে। বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাকে ৪ টি ভাগে ভাগ করা হলে সুরমার মিল হয় মেঘনা নদীর সাথে। এই দুটি নদী কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরববাজারের কাছে পুনরায় মিলিত হয়ে মেঘনা নদী গঠন করে। এবং পরিশেষে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। আবার সুরমা ও কুশিয়ারা মিলিত হয়ে কালনী নাম ধারণ করে। কালনী নদী পরে ভৈরব বাজারে এসে মিলিত হয়।

ইতিহাস-ঐতিহ্যে সুরমা নদীর কথা :: সিলেট একটি প্রাচীন জনপদ। বাংলাদেশের বিশাল অংশ যখন সাগরের গর্বে বিলীন, সিলেটে তখনো ছিল সভ্য সমাজ। সিলেটের ভাটি এলাকাও এক সময় ছিল সমুদ্র। কিন্তু উঁচু ও পার্বত্য এলাকায় ছিল জনবসতি। খৃষ্টপূর্ব চার হাজার অব্দেও সিলেটে উন্নত সমাজ ছিল। ১৩০৩ খৃষ্টাব্দে হযরত শাহজালাল (র:) আগমনের পর এ ভূখণ্ড শিলহট, জালালাবাদ, বা সিলেট নামে পরিচিত হয়ে উঠে। বিভিন্ন তন্ত্রতে সিলেটের উল্লেখ আছে। তন্ত্রগুলোতে সিলেটকে শ্রীহট্ট, শিরিহট্ট, শিলহট্, শিলহট বলা হয়েছে। এছাড়া হিন্দু শাস্ত্র গুলোতে সিলেটের নদ-নদীর নাম পাওয়া যায় রাজমালার বর্ণনায় জানা যায় আদিযুগে মনু যে নদীর তীরে বসে শিবপূজা করতেন সেটিই মনু নদী। তীর্থ চিন্তামণিতে আছে বরবক্রের বা বারাক নদীর উল্লেখ যোগ্য বর্ণনা। অমরকোষ অভিধানে বর্ণিত ‘শরাবতী’ কে অনেকেই সিলেটের সুরমা হিসেবে জানেন। এ সব নদীর পানি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে ছিল পবিত্র।

বিভিন্ন পর্যটকের বর্ণনায় সিলেটের সুরমা নদী :: হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে আরব পর্যটক সোলায়মান ছয়রাফী, পারস্য সাগর, ভারত সাগর ও বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করেন। তার বর্ণনায় বাংলার চট্টগ্রাম বন্দর ও সিলহেট বন্দরের কথা বারবার উল্লেখ আছে। আরবী ইতিহাসেও সিলহেট বন্দরের উল্লেখ পাওয়া যায়। মরক্কোর অধিবাসী শেষ আব্দুল্লাহ্ মোহাম্মদ ইবনে বতুতা হযরত শাহজালাল (র:) সাথে মোলাকাতের জন্য ১৩৪৬ খৃ: সিলেট আসেন। তিনি নহরে আজরকৃ দিয়ে জলপথে সিলেট আসেন। আরবী আজরক এর অর্থ হল নীল রং। নরওে আজরক অর্থ হল (সুর্মা) তাই সুরমা নদীরই নাম। তিনি সিলেটকে কামরূপের অন্তর্গত বলে চিহ্নিত করেছেন।

সুরমার তীরে ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন সমূহ :: চাদনীঘাট এর সিঁড়ি: সিলেটে সুরমার তীরে রয়েছে পুরোনো নিদর্শন চাদঁনীঘাটের সিঁড়ি। সিলেটকে আসামের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সিলেটবাসী প্রতিবাদের ঝড় তোলেন। তাদের সান্ত্বনা দেবার জন্য বড়লার্ট লর্ড নর্থব্রুক সিলেট উপস্থিত হন। এক দরবার অনুষ্ঠিত হয়। বড়লাটকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য সুরমা নদীর ঘাটের সুন্দর সিঁড়িগুলো তৈরি করা হয়।

আলী আমজাদের ঘড়ি: চাঁদনী ঘাট ও ক্বীন ব্রীজের পাশেই শোভা পাচ্ছে আলী আমজাদের ঘড়িঘর। পৃথ্বিমপাশার বিখ্যাত জমিদার আলী আমজাদ দিল্লীর চাদঁনীচকে শাহজাদী জাহানারার স্থাপিত ঘড়িঘর দেখে মুগ্ধ হন। তিনিও ইচ্ছা পূরণ করেন চাদঁনীচকে দেখা ঘড়িঘরের অনুকরণে সুরমা নদীর তীরে চাদঁনী ঘাটের কাছে একটি ঘড়িঘর তৈরি করে। সবার নিকট যা ‘আলী আমজাদের ঘড়ি’ বলে পরিচিত।

ক্বীন ব্রীজ: সিলেট নগরীর প্রবেশ দ্বার হচ্ছে ক্বীন ব্রীজ। সুরমা নদীর উপর স্থির ভাবে দাড়িয়ে থাকা এই ব্রীজটির রয়েছে ইতিহাস। গত শতকের তিরিশ দশকের দিকে আসাম প্রদেশের গভর্নর ছিলেন মাইকেল ক্বীন। তিনি তখন সিলেট সফরে আসেন। তার স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতেই এ ব্রীজটি নির্মাণ হয়। জানা যায়, সে সময়ে আসামের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল ট্রেন। রেলওয়ে ষ্টেশনটিও দক্ষিণ সুরমায় অবস্থিত। সঙ্গত কারণেই সুরমা নদীতে ব্রীজ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। রেলওয়ে বিভাগ ১৯৩৩ সালে সুরমা নদীর উপর ব্রীজ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। ১৯৩৬ সালে ব্রীজটি আনুষ্টানিক ভাবে খুলে দেওয়া হয়। ব্রীজটির নামকরণ করা হয় গভর্নর মাইকেল ক্বীনের নামে। ক্বীন ব্রীজটি লোহা দিয়ে তৈরি। এর আকৃতি ধনুকের ছিলার মত বাঁকানো। উপর ভাগ পিঞ্জিরার মত। ব্রীজটির দৈর্ঘ্য ১১৫০ ফুট। প্রস্থ ১৮ ফুট। ব্রীজটি নির্মাণ করতে তখনকার দিনে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৫৬ লাখ টাকা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ডিনামাইট দিয়ে ব্রীজের উত্তর পাশের একাংশ উড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতার পর কাঠ ও বেইলী পার্টস দিয়ে বিধ্বস্ত অংশটি মেরামত করে হালকা যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ব্রীজটি এক নজর দেখার জন্য প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক পর্যটনের ভিড় জমান সুরমার তীরে। সুরমার তীরে সুন্দরের ঝলকানিতে মোহিত হয় মানুষ। শহরের কোলাহল থেকে ক্ষানিত অবসর নিতে সুরমার তীরে এসে অবসাদ গ্রহণ করেন সৌন্দর্য পিয়াসুরা। সুরমার তীরে এই সুন্দরের চাদর চোখে না দেখলে কল্পনা করা যায় না।

সুরমাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সিলেটের সংস্কৃতি ও সভ্যতা। সিলেটের প্রকৃতি ও জীবনের সাথে এ নদী অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত। সিলেটের অস্তিত্বেও শেষ দিন পর্যন্ত ও যেন বেছে থাকে এ নদী।

এছাড়া সুরমা নদীর উপর দিয়ে নির্মিত হয়েছে আরো ব্রীজ সেগুলো হচ্ছে শাহজালাল ব্রীজ, শাহপরান ব্রীজ, টুকের বাজার ব্রীজ।
সিলেটকে সুরমা নদী মায়ের মত জড়িয়ে রেখেছে। এই নদীর কারণে গড়ে উঠেছে গ্রাম, গ্রাম থেকে জনপদ, লোকালয় ও শহর বন্দর। নদীগুলোর কারণে এই অঞ্চল শিল্প বানিজ্যালয়ে সমৃদ্ধি লাভ করেছে। সুরমার অনেক ছোট বড় প্রশাখা নদী রয়েছে। এসব উপনদী ও শাখা নদী গুলো বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেট বাসীর এই সুরমার ঐতিহ্য সংরক্ষণে নেই তেমন কোন উদ্যোগ। সিলেটে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর তীরে ক্বীন ব্রীজ এলাকাটির সুন্দর্য বর্ধিত হলেও সুরমার পাড় ভাঙ্গন ও সংরক্ষণে নেই তেমন কোন উল্লেখ যোগ্য পদক্ষেপ।

উৎস : ভারত

প্রবাহিত জেলা : সিলেট, সুনামগঞ্জ
প্রবাহিত উপজেলা : জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা, বিশ্বনাথ, কোম্পানীগঞ্জ, দোয়ারাবাজর, ছাতক, সুনামগঞ্জ সদর, জামালগঞ্জ ধর্মপাশা
সুরমা নদীর তীরবর্তী পৌরসভা ও বাজার সমূহ : সুনামগঞ্জ পৌরসভা, কানাইঘাট পৌরসভা, ছাতক পৌরসভা, সিলেট শহর, ছাতক হাট, দুহুলিয়া হাট, দোয়ারাবাজার, আমবাড়ি হাট, রাজাগঞ্জ বাজার, গোলাপগঞ্জ বাজার, কানাইঘাট বাজার, গাছবাড়ি বাজার, শাহগলি বাজার, রাজাগঞ্জ বাজার, সাচনাহাট, জয়নগর হাট ও ছাতক বন্দর ।
নদীর দৈর্ঘ্য : ২৪৯ কিলোমিটার
প্রশস্ত : গড় ১১১ মিটার
অববাহিকার আয়তন : পাওয়া যায়নি
প্রকৃতি : সর্পিল আকার
বন্যা প্রবণতা : বন্যা প্রবণ নয়
বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ : বাতীঁরে ১১২ এবং ডানতীরে ২৩.৪৫ কিলোমিটার
অববাহিকার প্রকল্প : জালিকার হাওর প্রকল্প ও পাগনের হাওর প্রকল্প
পানি প্রবাহের পরিমাণ : পাওয়া যায়নি

নৌ-রোড : নদীটি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃক নির্ধারিত প্রথম শ্রেণীর নৌ রোড

নদী নং : বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা “পাউবো” কর্তৃক ধলা নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী নং ৮৩ ।

তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশের নদনদী বর্তমান গতিপ্রকৃতি, মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, কথা প্রকাশ, আগস্ট ২০১৯, পৃষ্ঠা ২২৭,২২৮
২. বাংলাদেশের নদীকোষ, ড. অশোক বিশ্বাস, গতিধারা, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা ৩৫১-৩৫৩ ।
৩. .বাংলাদেশের নদ নদী , ম ইনামুল হক, জুলাই ২০১৭, অনুশীলন, পৃষ্ঠা ৫৭-৫৮,
৪. জেলা তথ্য বাতায়ন
৫. শ্রী হট্টের ইতিবৃত্ত পূর্বাংশ – অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি, পৃষ্ঠা ৩৮ প্রকাশক – মোস্তফা সেলিম, উৎস প্রকাশন ২০১৭
৬. বাংলাদেশে পানি উন্নয়ন বোর্ড ওয়েবসাইট ০৬.১০.২০১৯
৭. জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ওয়েবসাইট ০৬.১০.২০১৯
৮. সুরমা নদীর ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

Facebook Comments

About SylhetPedia

Read All Posts By SylhetPedia

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *